চাকমা গল্প

“পজ্জঙ”(গল্পগুজব)
Written by সুমন চাঙমা
একদিন কলেজ ছুটি পেয়ে,তাড়াতাড়ি বাসায় এসে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলাম। তারপর ব্যাগ গোছানো শেষে,অনেক হাসি খুশি মনে আমার মাকে ফোন করলাম। মাকে ফোন করে বললাম…মা আমি আজ রাত আটটার বাসে উঠবো! আমি বাড়িতে আসবো,আমরা কলেজ ছুটি পেয়েছি।তারপর রাত সাড়ে ছয়টায় রাতের খাবার রান্না করলাম। সাতটায় খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চার তলা থেকে লাগেস্ট হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম,,,ঠিক সেই সময় মোবাইলের রিং বাজতে লাগলো। মোবাইলটা বের করে দেখলাম বাবার ফোন! বাবাকে বললাম,,, বাবা আমি বেরিয়ে পড়েছি, তোমরা চিন্তা করো না!কাল সকালে বাস স্টেশনে পৌঁছলে আমি তোমাদের ফোন করবো। তারপর রওনা দিলাম ঢাকার গুলশান থেকে আমার জন্মভূমি খাগড়াছড়িতে। তারপর কিছুক্ষণ পর বাস স্টেশনে পৌঁছালাম। রাত 8 টা 10 মিনিটে বাসে উঠলাম।বাসে জানালার পাশে একটি সিটে বসে পড়লাম তারপর কিছুক্ষণ মোবাইল ঘাটাঘাটি করে , ব্যাগ থেকে এয়ার ফোন বের করে গান শুনতে লাগলাম। গান শুনতে শুনতে আমার মনে শুধু একটাই চিন্তা ভাবনা যে,, কখন বাড়িতে পৌঁছাবো!এসব চিন্তা করতে করতে কখন যে কুমিল্লা বাস স্টেশনে এসে পৌছালাম টের,,ই পেলাম না। তারপর ওখান থেকে বাস ছেড়ে আবারও এসব ভাবনা আমার মনে বাজনা বাজতে লাগলো!কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের ই পেলাম না।তারপর সকালে চোখ মেলে দেখলাম খাগড়াছড়ি বাস স্টেশনে।বাস থেকে নেমে প্রায় 30 মিনিট পর আমার নিজের বাড়িতে পৌঁছালাম। আমার বাবা-মা, দাদা-দাদি আর আমার বোন আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমি প্রথমে বাবা-মা, দাদা-দাদী কে প্রণাম করলাম। সেদিন অনেক দিন পর বাড়িতে গিয়েছিলাম তাই অনেক খুশি হয়েছিলেন আমার মা-বাবা ও পরিবারের সবাই। আমাদের দুই ভাই বোনের একটা অভ্যাস ছিল যে আমরা দাদির কাছ থেকে বিকেলে গল্পগুজব শুনতাম। তাই সেদিন রাতেও খাবার খেয়ে আমি আর আমার বোন দাদা-দাদীর কাছে বায়না করতে লাগলাম যে,আমাদের পজ্জঙ(গল্প) শোনাতে।তারপর দাদা আর দাদি আমাদের শোনাতে লাগলো সেই,,,১৯৫৮থেকে১৯৬২ সালের “বড়গাঙ মু”(কাপ্তাই মুখ) এ বাঁধ দেওয়ার কথা। তারপর কিছুক্ষণ পর যখন বাঁধ দেওয়ার ফলে,,, নিজের ভিটা ছেড়ে চলে যাওয়া, ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ার কথা, কোথায় যাবো?কি খেয়ে বেঁচে থাকব? দেশ সেরে যেতে হবে, থাকতে হবে অন্য দেশে শরণার্থী হয়ে। এসব কথা শুনতে-শুনতে কখন যে,,চোখ দিয়ে পানি ঝর ঝর করে পড়ে গেল আমি কিছুই বুঝতে পারেনি। তারপর পজ্জঙ শেষ করে দিয়ে দাদা আর দাদি ও আমার বোন ঘুমাতে গেল। সেদিন রাতে চাঁদের আলোয় নিঝুম রাতের দৃশ্যটা ছিল বেশ ভালো। তারপর আমি আবার বাইরে একা বসে বসে ভাবতে লাগলাম ১৯৫৮ সালে কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার কথা। সেসময় আমাদের পাহাড়ি মানুষদের কষ্টগুলো যেন অন্যরকম।সেসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে,,রাত গভীর হলো বুঝতেও পারিনি।যখন মোবাইলটা দেখলাম তখন দেখলাম রাত ১২টা বাজার আর ও ১৫ মিনিট বাকি। তারপর আর কিছু না ভেবে ঘুমাতে গেলাম।
সেদিনের অনুভূতিটা ছিল যেন শত শত রাশি বেদনার।
তারিখ-০৮/১২/২০২১

Leave a Comment