সচেতনতা মূলক প্রবন্ধ

নীরব কান্না
লেখা:সুমন চাকমা
আজ ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি ফিরলাম।পাহাড়ে আমার জন্ম,তাই আমি মনে করি পাহাড় আমার অহংকার,পাহাড় আমার গর্ব,পাহাড় আমার অস্তিত্ব।ঢাকায় পড়াশোনার ব্যস্ততায় কতদিন পাহাড়ে ওঠা ও দেখা হয়নি।তাই খাওয়া-দাওয়া শেষে বিকেলে খুব আনন্দে পাহাড়ের উঁচু পথ বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম।

আমার মা বাড়ির উঠানে আমাদের চাকমা জাতির ঐতিহ্যবাহী ড্রেস পিনোন বুনন করছিলেন।

আর উঠানের এককোণে আমার বাবা বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করেছিলেন নানা ধরনের আসবাবপত্র অর্থাৎ মারাল্লে,হাল্লোঙ। পাহাড়ের প্রতি আমার মুগ্ধতা ও ভালবাসা দেখে মা ও বাবা যেন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে এবং মুচকি মুচকি হাসে ও আনন্দ
পায়।

তারপর প্রায় ৩০ মিনিট পর পাহাড়ের চূড়ায় পৌছালাম আমি। পাহাড়ের মলয় বাতাস,পাহাড়ের সুন্দর দৃশ্য আমায় আরো মুগ্ধ করে তোলে। পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের পাহাড়ের ভাঁজগুলোকে দেখতে খুবই ভালো লাগছিলো। আর পাহাড়ের ভাঁজে দেখা যাচ্ছে আমাদের অর্থাৎ চাকমাদের মাচার(মাটি থেকে কিছুটা উপরে) ঘরগুলো। দেখতে খুবই ভালো লাগছে। আর পাহাড়ের এক্ককোণে দেখা যাচ্ছে জুম্ম ধানের শীষ, সারি সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা কলাগাছ।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে বিনা মেঘে গুড়ি গুড়ি করে বৃষ্টি পড়তে লাগলো।তাই আমি পাহাড়ের চূড়ায় থাকা একটি ছোট জুম ঘরে ঢুকে পড়ি। আমাদের জুমঘর গুলো খুবই সুন্দর,,কারণ এই ঘরগুলো মাটি থেকে উপরে হয় আর সন দিয়ে তৈরি। সেখানে বসে বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে আমার খুবই ভালো লাগছিল। বৃষ্টিটা মোটেই থামছিল না,, তাই আমি কিছুটা আলস্য বোধ করলাম,, আলস্য বোধটা কাটানোর জন্য আমি পকেট থেকে ইয়ারফোন বের করে গান শুনতে শুরু করলাম।,,
কিছুক্ষণ পর গান শোনা বন্ধ করে,,
বসে বসে চিন্তা করছিলাম, সময়ের সাথে সাথে সবকিছু বদলে যাচ্ছে,বদলে যাচ্ছে পোশাক-আশাক,বদলে যাচ্ছে রীতিনীতি, বদলে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, বদলে যাচ্ছে কথাবার্তা,বদলে যাচ্ছে সবকিছু। তারপর ভেবে দেখলাম, আমাদের চাকমা জাতির রীতিনীতি,ঘরবাড়ি, পোশাক-আশাক ও একটু একটু করে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। নিজ জাতের পোশাক-আশাক ছেড়ে আমাদের চাকমা আদিবাসীর তরুণ-তরুণীরা যুগের সাথে তালে তাল মিলিয়ে যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে অন্য জাতির মতো।

তারপর দেখলাম পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে নির্মিত হচ্ছে পর্যটন কেন্দ্র,, আমার মনটা কেমন জানি করে উঠলো। কারণ পাহাড়ে পর্যটন কেন্দ্র নির্মিত হওয়া মানে তো একটু একটু করে নিজের ভিটাকে হারিয়ে ফেলা। আর যেখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, সেখানকার আশেপাশের জায়গা গুলো কেড়ে নিচ্ছে সেটেলাররা। সত্যি আগের মত আর এই পাহাড়ে কোন শান্তি নেই,সুখ নেই। সেই কবে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর,,, বাংলাদেশ সরকার যে চুক্তি করেছিল যে এই পাহাড়ে আবার শান্তি ফিরে আসবে! কিন্তু কবে? আমার মনে বিশাল প্রশ্ন জাগে,,যে কবে ফিরে আসবে সেই শান্তি? কবে বাস্তবায়ন হবে সে শান্তি চুক্তি? পাহাড়ি মা-বাবার কবে শেষ হবে সেই শান্তির অপেক্ষায় থাকা দিনগুলো? কবে নিস্তব্ধ হবে পাহাড়ি মায়ের নীরব কান্না? আদৌ কি বাস্তবায়ন হবে সেই চুক্তি?

আমাদের চাকমা জাতির ছোট ছোট ভাই বোনেরা শিখছে, অন্য জাতির ভাষা, জানছে শুধুই অন্য জাতির ইতিহাস, অন্য জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস,,! কবে পড়বে চাকমাদের ইতিহাস?কবে পড়বে চাকমা ভাষা?সেগুলো ভেবে ভেবে আমার মনটা যেন দুকরে কেঁদে ওঠে,,,, মনে মনে বলি যেন, এইতো আমরা সবকিছু হারিয়ে ফেললাম! হারিয়ে ফেললাম আমাদের ভাষা, ইতিহাস,রীতিনীতি,পোশাক-আশাক, ধর্ম সবকিছু!

তাই আমিও যেন নীরবে কোথায় হারিয়ে যায়, মনটা যেন দুকড়ে দুকড়ে কেঁদে ওটে। কিন্তু না এভাবে কেঁদে কেঁদে থাকলে তো কিছুই হবে না,মনে মনে ভেঙে পড়লে তো কিছু হবে না! এগোতে হবে, আমাদের জানাতে হবে সবকিছু,,, শেখাতে হবে সবকিছু ছোট ছোট ভাই-বোন,তরুণ-তরুণী নতুন প্রজন্মকে। আমরা যদি এভাবে আগেভাগে সচেতন হয়ে উঠি! তাহলে আমাদের জাতকে,আমাদের ইতিহাস কে বাঁচিয়ে রাখতে পারব!
লিখে লিখে, যে যেভাবে পারে ছিটিয়ে দিতে হবে আমাদের চাকমা ইতিহাস, চাকমা ভাষা সম্পর্কে। আর এভাবেই পাহাড়ি মা-বোনের,পাহাড়ি বাবা-ভাইয়ের নীরব কান্না থামাতে হবে।
এই চেতনা নিয়ে দৌড়ে ছুটে নেমে আছি পাহাড় বেয়ে।
সমাপ্ত

Leave a Comment